মানবপাচার প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিন
- আপলোড সময় : ১৫-১২-২০২৫ ০৯:৩৩:৪০ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৫-১২-২০২৫ ০৯:৩৩:৪০ পূর্বাহ্ন
গ্রিসে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সমুদ্রে নেমে সুনামগঞ্জের দুই যুবকের করুণ মৃত্যু শুধু দুটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির জন্য এক গভীর বেদনা ও সতর্কবার্তা। লিবিয়া থেকে গ্রিস অভিমুখে নৌপথে অনুপ্রবেশের চেষ্টায় প্রায় ৪০ জন বাংলাদেশির জীবন যখন বিপন্ন হয়, তখন প্রশ্ন জাগে- কেন বারবার একই বিপজ্জনক পথে আমাদের তরুণরা মৃত্যুর ঝুঁকি নিচ্ছে?
নিহত শাকিব আহমেদ শুভ ও সায়েম আহমেদের মৃত্যুর পেছনে যে নির্মম বাস্তবতা উঠে এসেছে, তা ভয়াবহ। তীব্র শীত, ক্ষুধা ও পানিশূন্যতার মধ্যে মানবপাচারকারীদের অমানবিক আচরণে বাধ্য হয়ে পেট্রোল পান করার মতো চরম সিদ্ধান্ত - এ যেন সভ্যতার এক নির্মম ব্যর্থতা। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে দালালচক্র যেভাবে তরুণদের সমুদ্রের মৃত্যুকূপে ঠেলে দিচ্ছে, তা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
আরও উদ্বেগজনক হলো- ইউরোপে অবৈধ অভিবাসনে বাংলাদেশিদের শীর্ষ অবস্থান। ফ্রন্টেক্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসে ইউরোপে অবৈধ প্রবেশ সামগ্রিকভাবে কমলেও বাংলাদেশিদের উপস্থিতি কমেনি। বরং ভূমধ্যসাগরীয় রুটে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি। লিবিয়া থেকে ইতালি কিংবা গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের দিকে যাত্রা বেড়েছে বহুগুণ। এর অর্থ, ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও মানুষ এই পথে যাচ্ছে- কারণ তাদের সামনে নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত বিকল্প নেই।
এই সংকটের পেছনে একাধিক কারণ স্পষ্ট। দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব, দক্ষতার স্বীকৃত সুযোগ না থাকা, বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়ার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা, আর বিদেশে উচ্চ আয়ের মোহ - সব মিলিয়ে তরুণরা সহজ পথে ফাঁদে পড়ছে। মানবপাচারকারীরা এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই “নিশ্চিত ইউরোপ”র মিথ্যা স্বপ্ন বিক্রি করছে।
গ্রিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের তৎপরতা ও সতর্কবার্তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে শুধু সতর্কতা যথেষ্ট নয়। এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। প্রথমত, মানবপাচার দমনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দালালচক্রের আর্থিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে এই মৃত্যু মিছিল থামবে না। দ্বিতীয়ত, বৈধ অভিবাসনের পথ সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে - বিশেষ করে দক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিকদের জন্য ইউরোপ ও অন্যান্য গন্তব্যে সরকারিভাবে শ্রমচুক্তি বাড়ানো জরুরি। তৃতীয়ত, দেশেই কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারলে তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা নিরুৎসাহিত করা যাবে না।
ভূমধ্যসাগরে এ বছর অন্তত ১ হাজার ৭০০ মানুষের মৃত্যু আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই মৃত্যুর পরিসংখ্যানের পেছনে লুকিয়ে আছে অসংখ্য ভাঙা স্বপ্ন ও শোকাহত পরিবার। সুনামগঞ্জের দুই যুবকের মরদেহ দেশে ফেরার আগেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে- আমরা কি কেবল লাশ গুনব, নাকি এই অবৈধ ও প্রাণঘাতী অভিবাসনের পথ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেব? ইউরোপের পথে সমুদ্র যেন আর কোনো বাংলাদেশির কবর না হয় - এই প্রত্যাশাই আজ সময়ের দাবি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়